আলকাপ গান বাংলার সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য। বহু আগে থেকে গ্রামীণ বাংলায় এই গান মানুষকে বিনোদন দিয়ে আসছে তবে বর্তমানে এ গান গ্রাম বাংলাতেও তেমন একটা দেখা যায় না। আলকাপ মূলত সঙ্গীতধর্মী নাট্যনুষ্ঠান এবং তা রাজশাহী অঞ্চলের গান। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁর কিছু এলাকা, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ অঞ্চলে এই গানের প্রচলন আছে। এ গান পালাগানের একটি শাখা। এই গানের উদ্ভব কোথায়, কীভাবে হয়েছিল তা সঠিক করে বলা এক দুরূহ ব্যাপার। অনেকে গম্ভীরাকে আদি আলকাপ গানের একটা শাখা হিসেবে মনে করে থাকে।
আলকাপ লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত। খোশ গল্প-গুজবের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, মশকরা, টিপ্পনি কাটা ইত্যাদি আলকাপের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দু’দশক আগে পুরো চাঁপাই নবাবগঞ্জ,রাজশাহীর জেলার কোন কোন অংশের লোকজনের মুখে মুখে প্রতিনিয়ত আলকাপের কলি ঘুরে ফিরে শোনা যেত। আলকাপের গানই ছিল তাদের প্রধান উপজীব্য। এ গান মাটির গান, মানুষের গান। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের হাসি, আনন্দ-দু:খ. বিরহ-ব্যথা, চাওয়া-পাওয়া. সামাজিক বাধা-বিপত্তি, অনাচার, জটিলতা, কুটিলতা সর্বোপরি জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে আলকাপ গান রচিত। আলকাপের গান স্থানীয় ভাষায় পরিবেশিত হবার ফলে এটি মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করত।
অনুর্ধ্ব দেড়শো বছর আগে বর্তমান চাঁপাই নবাবগঞ্জের জেলার শিবগঞ্জ থানার সীমান্তবর্তী মোনাকষা গ্রামের বনমালী শীল ওরফে বোনা কানাই (এ নামেই বেশি পরিচিত) প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আলকাপ গানের সূচনা করেন। তিনি পেশায় নরসুন্দর তথা নাপিত ছিলেন, তাঁর একটি চোখ ছিলনা। বোনা কানাইয়ের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে অনেক শিষ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা যেমন মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, রাজশাহী প্রভৃতি জেলায় আলকাপ ছড়িয়ে পড়ে আর ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
পশ্চিম বাংলার গবেষকরাও বোনা কানাইকে আলকাপ গানের জনক হিসেবে মনে করেন।
প্রায় দশ বছর পূর্বে ‘আকাশ বাণী’-র এক আলোচনায় বোনা কানাইকে আলকাপ গানের প্রবর্তক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
প্রখ্যাত আলকাপ সরকার সুবল কানার একটি ছড়ায় মালদহ, নবাবগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, জঙ্গীপুর, নুরপুর, রাজমহল ইত্যাদি অঞ্চলের বিভিন্ন সরকারদের (আলকাপ দলের নেতা) নাম পাওয়া যায়।
এই গানের আসর খুবই সুন্দর হয়ে থাকে। গ্রামের ফাঁকা জায়গায় বিশেষ করে উঠানে এই গানের আসর বসে। গানের দলের সবাই উঠানের মাঝখানে গোল হয়ে বসে এবং তাদের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গা রাখে যেখানে তারা অভিনয় করে। আর সকল দর্শকের সেই গানের দলকে ঘিরে গোল হয়ে বসে। মহিলা দর্শকেরা পাশে একটু দূরে বসে। গানের আসরে আগে বিদ্যুতের অভাবে হ্যাজাগ বাতি ব্যবহার করা হত। এখন বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করা হয়। সাথে হ্যাজাগও থাকে বিদ্যুৎ চলে গেলে ব্যবহার করা হয়। তবে বিদ্যুতের বাতির আলোর চেয়ে হ্যাজাগ ব্যবহারে আসরের ঐতিহ্য বেশি ফুটে উঠে।
আলকাপ দলের মূল আকর্ষণ হলো নাচিয়ে ছোকরা এবং কাপদার বা কমেডিয়ান৷ এ দুজনকে নায়ক-নায়িকার সঙ্গে তুলনা করা যায়৷ এ দুজনই আলকাপ গানের প্রাণ ও কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়৷ এদের ছাড়া আলকাপ গানের অনুষ্ঠান হতেই পারে না৷ তবে ছোকরা বাছাই করা তত সহজ কাজ নয়৷ জানা যায়, কম বয়সেই তাকে দলে ভর্তি করা হয়৷ তাকে সুন্দর হতে হয়, গানের গলা থাকতে হয়৷ এ দুটো প্রাথমিক শর্ত৷ তাছাড়া তাকে নাচও শিখতে হয়৷ ছোকরাকে মেয়েদের মতো কেশ রাখতে হয়৷ গায়ে পরতে হয় মেয়েলী পোশাক, হাতে চুড়ি এবং তাকে ভুলে থাকতে হয় যে সে একজন পুরুষ৷
যাহোক এখন আর আলকাপের গান তেমন একটা হয় না।কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কেউ আর খোঁজ নেয় না। আর এভাবে এই আলকাপ গানের মত আমাদের দেশের অনেক সংস্কৃতি আছে যেগুলো দিন দিন এতিম হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্বতাকে।
মূলত পৃষ্ঠপোষকতা নেই বলে সংস্কৃতির এই সম্পদ হারাতে বসেছে আজ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী এলাকায় আলকাপ গানের কয়েকটি স্বনামধন্য দলের মধ্যে তানোরের শ্রীকান্ত সরকার, হেমু সরকার, আব্দুস সালাম কেরামত সরকার, মহারাজপুরের এসলাম সরকার, নাচোলের চেরু সরকারের দলগুলো অন্যতম। শ্রীকান্ত সরকারের জানান, এ গানের প্রতি আগ্রহ এখনও মানুষের আছে। তাছাড়া এ গানের মধ্য দিয়ে সমাজের অনেক অসংলগ্ন দিক ফুটে ওঠার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করে তোলে এই গানে। তিনি আরও বলেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই গানকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব।’ আলকাপ গানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি। তাছাড়া শুধু আলকাপ গান নয় আরও বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক গান রয়েছে যেগুলো আজ হারাতে বসেছে। এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এসব সংস্কৃতিই একটি জাতির পরিচয় বহন করে থাকে। তাই জাতীয় স্বার্থেই আমাদের সংস্কৃতিগুলো টিকিয়ে রাখা উচিত।