পুর্ণেন্দু স্মৃতি শিল্পগ্রাম,ধান্দালী,হাওড়া |
Purnendu Smriti Shilpogram,Dhandali, Howrah
প্রাণারাম তীর্থযাত্রা : ৩ || 07.12.2024
#Pranaram Travelogs
Contact : Ranajit Kumar Raut
9830865034
Purnendu Smriti Shilpogram: এখানে সৃষ্টিতেই বেঁধে রয়েছেন শিল্পী ! আতিথেয়তায় জুড়োবে প্রাণ
লেখক, কবি, চিত্রশিল্পী, পরিচালক প্রয়াত পূর্ণেন্দু পত্রীর স্মরণে, তাঁর সৃষ্টিকে ধরে রাখার অভিনব প্রয়াস। 'পূর্ণেন্দু স্মৃতি শিল্পগ্রাম' তৈরি করেন তাঁর শিষ্য রণজিৎ রাউত, ২০১০ সালে।
☀️শিল্পীর নামে মায়াবী গ্রাম উলুবেড়িয়ায়
গাছে পর পর বাঁধা পঞ্চাশটির বেশি ঘণ্টা। সবাই বলে ‘ঘণ্টাবৃক্ষ’। অসমের দুলিয়াজন এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের ইচ্ছেপূরণের জন্য এইভাবে ঘণ্টা বেঁধে রাখেন গাছে। সেই পরম্পরাই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। আছে ‘কৃষ্টি কলস’। চারটে বড়ো বড় জালা। এক সময়ে সেই জালাগুলোতে কুইন্টাল কুইন্টাল চাল রাখতেন গ্রামবাসীরা। রয়েছে কংক্রিটে তৈরি ‘স্বপ্নসৃজন বেদি’। এসব নিয়েই ছবির মতো সুন্দর ‘পূর্ণেন্দু স্মৃতি শিল্পগ্রাম’। হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমায় ধান্দালি গ্রামে পাওয়া যাবে সেই মায়ার খোঁজ।
গ্রামের ছেলে রণজিৎ রাউত। বাড়ি শ্যামপুরের পলতাবেড়িয়ায়। ছোটো থেকেই শিল্পী হওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল নিম্নবিত্ত চাষি পরিবারের আর্থিক অবস্থা। পাশেই নাকোল গ্রামে শিল্পী-ঔপন্যাসিক-চলচ্চিত্রকার পূর্ণেন্দু পত্রীর বাড়ি। রণজিতের বড়দা বিধুভূষণ ভাইকে পরামর্শ দিলেন শিল্পীর সঙ্গে দেখা করতে। পূর্ণেন্দু তখন কলকাতায় থাকেন। মাঝেমধ্যে কাটিয়ে আসেন গ্রামের বাড়িতে। একদিন তিনি দেশের বাড়িতেই রয়েছেন, রণজিৎ গিয়ে যোগাযোগ করলেন তাঁর সঙ্গে। সব কথা শুনে শিল্পী আর্থিক সাহায্য তো সাধ্যমতো করলেনই, রণজিৎকে ভর্তি করিয়ে দিলেন কলকাতার আর্টস্কুলে। তারপর একদিন রণজিৎ নিজেই তৈরি করলেন নিজের আর্টস্কুল। ইতিমধ্যেই তিনি শিল্পীর ঘনিষ্ঠ শিষ্য হয়ে উঠেছেন। পূর্ণেন্দু পত্রী মারা গেলে রণজিৎ তাঁর স্মৃতিতে নাকোল গ্রামে একটি মেলার আয়োজন করেন। নাম পূর্ণেন্দু মেলা। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী গৌরী, বড়দা বিধুভূষণ, বিশ্বনাথ দোলুই, তাঁর স্ত্রী বিমলা দোলুই এবং আরো কয়েকজন। চার বছর পর মেলা সরে যায় ধান্দালি গ্রামে। তারপর সেখানেই পাঁচ বিঘে জমিতে ওই শিল্পগ্রামের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শিল্পগ্রামের উদ্বোধন করেন অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। পূর্ণেন্দুরই পরিচালিত ‘স্ত্রীর পত্র’ ছবির নায়িকা। পাঁচিল ঘেরা গ্রামে ঢোকার মুখেই বোর্ডে লেখা রয়েছে, “প্রয়াত পূর্ণেন্দু পত্রীকে মনে রেখে একজন সংগ্রামী শিল্পীর স্বপ্ন দিয়ে গড়া হারিয়ে যাওয়া বাংলাকে ফিরিয়ে আনার প্রাণিত প্রয়াস”। শিল্পগ্রামের ঠিক মাঝখানে একটি বড়ো নিমগাছ রয়েছে। তার নিচে জমজমাট চায়ের আড্ডা বসানো যেতে পারে, আয়োজন করা যেতে পারে গল্প দাদুর আসর। একটি ঢেঁকি রাখা আছে পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত বাগানের ঠিক পাশেই। তার গায়ের হাতে আঁকা ছবি মুগ্ধ করবে রসজ্ঞ মানুষকে। এছাড়া রয়েছে ‘পূর্ণেন্দু স্মৃতি তোরণ’ আর সিমেন্টের চেয়ার দিয়ে সাজানো ‘পূর্ণেন্দু স্মৃতি মুক্তমঞ্চ’। পাশাপাশি আছে কচিকাঁচাদের ছবি আঁকার আসর ‘আকডুম’, ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ুয়াদের জন্য ‘পূর্ণেন্দু স্মৃতি শিক্ষা নিকেতন’। শিল্প প্রদর্শনের মুক্ত সংগ্রহশালা, শিকড়-বাকড়ের তৈরি শিল্পকর্মের দুর্লভ সংগ্রহও এখানকার অমূল্য সম্পদ। যাঁরা এখানে গিয়ে চড়ুইভাতি করতে চান, তাঁরাও বিফল হবেন না। খাদ্যরসিকের মনোরঞ্জন করতে ‘রাঁধাবাড়া ঘর’ রয়েছে।
এতকিছুর মধ্যে চিরন্তন গ্রাম বাংলার ফ্লেভারও কিন্তু এখানে বাদ যায়নি। পুকুরে ভেসে রয়েছে লাল শালুক, কালো জলে খেলে বেড়াচ্ছে রাজহাঁসের দল। সন্ধে নামলেই ঝিঁঝির ডাক। তুলসীর বেদিতে জ্বলে ওঠে প্রদীপ। নাগরিক ক্লান্তি থেকে ক্ষণিকের মুক্তির জন্য কখনও যদি সেই শিল্পগ্রামে ঘুরে আসতে চান, তাহলে বেড়িয়ে পড়তে হবে উলুবেড়িয়ার রাস্তায়। গড়চুমুক-আটান্ন গেট থেকে উলুবেড়িয়া যেতে ২ কিলোমিটার পরেই ধান্দালি স্টপেজ। সেখান থেকে ঢুকতে হবে বোরালিয়ার রাস্তায়। পাশে দেখা মিলবে সেই মায়াবী গ্রামের।